বাংলাদেশের একটি খুব
শক্তিশালী সম্প্রদায় আছে- “সভ্য সুশীল” সমাজ। শক্তিশালী বলছি এই জন্য যে তারা
মোটামোটি প্রতি রাতেই টিভি চ্যানেল গুলোতে বক্তব্য দিয়ে সাউন্ড সিস্টেম ফাটিয়ে
দেন। “হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা, পিটিয়ে ছাগল man করেঙ্গা”-টাইপ আরকি ! আমার এই লেখা এই সমাজ কে
নিয়ে নয়, বরং যারা এই সমাজকে তৈরি করছে তাদের কে নিয়ে।কারা এরা? এরা আমাদের দেশের
সাংবাদিক সম্প্রদায়! একই লোককে তারা কখনো রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, কখনো অর্থনৈতিক
বিশেষজ্ঞ, কখনো সামাজিক বিশেষজ্ঞ, কখনো ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ, কখনো কম্পিউটার
বিশেষজ্ঞ আবার কখনো বিশ্ব বিশেষজ্ঞ হিসাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন। ভাব দেখে
মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা সবাই ঢেউটিন আর উনারা যাকে আনবেন সেই অহীপ্রাপ্ত!!!
আমি বলব না যে সবাই এক, আবার এও বলব না যে কেউ ই ঠিক নাই। শুধু বলব, খারাপ ব্যাপারগুলো চোখে পড়ে সহজে আর এক ঝুড়ি আমের মধ্যে পচা আমটা না সরালে অথবা আলাদা না করলে, দোষটা বাকি সবার উপরেই সমান ভাবে পড়ে। কিন্তু whistle blower কেউ ই কি নাই? দুঃখটা ঐখানেই...
জাতির বিবেক নাকি
সাংবাদিকের কাঁধে থাকে। তারা আমাদের সভ্যতার পথ দেখান এবং আঙ্গুল তুলে অসঙ্গতি
তুলে জবাবদিহিতার ব্যাবস্থা করেন। কিন্তু উনারা কি এসবের বাইরে? নাকি ওনাদের কোন
জবাবদিহিতা নাই? কয়েকটা নাড়া দেওয়া ঘটনা অথবা উদাহরন নিয়ে দেখি-
১. গাড়ি পোড়ানোর ছবি-
খুব সুন্দর ও অমায়িক ভাবে তারা সেই ছবি সংগ্রহ করেন। অনেকটা টিউটরিয়ালের মত করে step by step ছবি দিয়ে দেখান কি করে পেট্রোল ঢালতে হয়,
আগুন লাগাতে হয়... ভাল ত ! কিন্তু আমার কথা হল exact
timing করে সেই ছবি তোলা কি করে সম্ভব? নাকি আগুন দেওয়ার আগে pose দিয়ে তারা দাড়িয়ে ছিল যেন photographer ছবিটা তুলতে পারে? সব মেনে নিলেও এটা মানতে কষ্ট
হয়, তাহলে কি আগুন লাগানর পরে সেই সাংবাদিক অপেক্ষা করেন কতক্ষনে অই গাড়ীটা
ভস্মীভূত হবে? নাহলে কেন সেই আগুনটা ছড়াতে দেওয়া হয়???
২. শুধুই রানার?-
কেঁদে কেঁদে আহাজারি করা মানুষের পাশে দাড়িয়ে যখন সাংবাদিক নামের মানুষটা
মাইক্রোফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলে-“আপনার অনুভূতি টুকু জানতে চাই” কিংবা জীবন যুদ্ধে
সর্বস্ব হারানো মানুষটির ভাবলেশহীন অবয়বের পাশে দাড়িয়ে যখন কাব্যযুক্ত আফসোস বাক্য
কপচান, তখন তাকে আমাদের বিবেক ভাবতে লজ্জা লাগে। শুধুই কি তারা এপাশের খবর অপাশের
খবর আমাদের প্লেটে এনে দিবেন? নাকি তাদের ও কোন দায়িত্ববোধ আছে? খবরের এই অংশটুকু
করেই যদি সাংবাদিক হতে পারে কেউ, তাহলে তাকে সাংবাদিক না বলে – সংবাদ wholesaler বা জোগানদার বলা ভাল। কয়টা ক্ষেত্রে আপনি
দেখেন সেই কাব্য কপচানোর পরে ওই অসহায় মানুষটির ভাগ্য বদলাতে? কিংবা কোন অসঙ্গতির follow up করতে? সে লোকটি সেখানেই থাকে, কান্না বাড়তেই
থাকে, মাঝখান থেকে সাংবাদিকটি তার একটি সংবাদ প্লট পান। কোন কিছুই বদলায় না।
৩. যত মত, তত গত- সব
সংবাদেই শুনি বা দেখি, “এ ব্যাপারে অমুকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন...” “নির্ভরযোগ্য
সূত্রমতে...” অথবা “এলাকা বাসীর ভাষ্যমতে...” এর মানে দাঁড়ায়, সংবাদটি সম্পর্কে
সত্যটার কয়েকটা version আছে। এবং সেটা
আমাদের সামনে লেংটা করে আবারো প্রমান করা হল। কিন্তু সত্য কখনই একাধিক হবে না।
তাহলে সেখানে সাংবাদিকের মত বা ভাষ্যটা কোথায়? সে কি ভাষ্যটা দিতে ভয় পাচ্ছে? নাকি
সে আবার সেই জোগানদার? প্রকৃত সত্যটা সাংবাদিকের নির্ভয়ে প্রকাশ করাটাই বিবেকের
কাজ। এক্ষেত্রে বিবেক বড়ই যন্ত্রনাদায়ক হয়ে ওঠে।
৪. আসমানে তোলা- খুব
বেশি হয় আমাদের দেশের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে। যখনই একটু ভাল করা শুরু করে তখন ই শুরু
হয়ে যায় তার সাথে মহাগুরু ইতং বিতং বিশেষনের আধিক্যে আসল নাম হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম।
সাদা বাংলায় যাকে বলে pump দেওয়া !!!pump এর চোটে আসমানে উঠে গেলে পরে যখন pump বন্ধ হয়ে যায় তখন সেই খেলোয়াড়টি মাটিতে পড়ে হাড়গোড় ভাংতে
বাধ্য !!! উলটা ঘটনাও ঘটে- বিশেষজ্ঞ দের বিশেষজ্ঞ বনে যান সাংবাদিকরাই। ওর দিন
শেষ, ওকে সরানো হোক ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু ভাল করা শুরু করলেই নম নম। এটা শুধু
আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য না, মোটামুটি সারা বিশ্বেই আছে। কিন্তু আমাদের দেশে
সেটা খুব extreme যা অনেক খেলোয়াড়ের
জন্যই কষ্টকর।
৫. বিবেকের আয়না,
চেহারা দেখা যায়না- খুবই হতাশাজনক একটা দিক। সাংবাদিকরা যদি সমাজের আদর্শবান
বিবেকের আয়না-ই হবেন, তাহলে তাদের কে দেখেই অন্যদের অনুসরন করা উচিত। sticker লাগিয়ে wrong
side দিয়ে চলা, number plate এর জায়গায়ে “প্রেস”
লিখে বেড়ানো, প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষে ধূমপান করে বিরক্তির উদ্রেক ঘটানো
ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাবুন ত একবার।
আগাড়ে-বাগাড়ে এখন নতুন
trend হল online
news site/portal খোলার। সেই খবর আদৌ সত্য কিনা সেটা পরে দেখা যাবে
অবস্থা...
কোথায় যেন একটা কাহিনী
পড়েছিলাম, ব্রিটিশ আমলে এক গ্রামে রামায়ন পালা চলছে। স্থানীয় থানা থেকে ইংরেজ
সাহেব এসেছেন বাঙ্গাল পালা দেখে মজা নিতে। পালা শুরু হল। সবাই মন প্রান দিয়ে অভিনয়
করছে। সাহেব কিছুই না বুঝের উশখুশ করছেন। এই সময়ে stage
এ ঢুকল হনুমানজি। সাহেব ত হনুমানকে দেখে খুব খুশি। সাথে সাথে টাকা ছুঁড়ে
দিলেন আর তালি দিয়ে গরম করে ফেললেন এলাকা। পালাকর দেখল বাহ, ভাল মওকা। সাথে সাথে
আরেকজন কে হনুমানের সাজে stage এ তুলে
ফেললেন। সাহেব দ্বিগুন খুশি, আবারও টাকা নিক্ষেপ আর তুমুল তালি... “more honu more honu”
বলে চিৎকার... এরপর একে একে সব অভিনেতা অভিনেত্রী লেগে পড়ল হনুমান সাজে stage এ উঠতে আর টাকা কুড়াতে। টাকার নেশায় রাম হারিয়ে সব
হনুমান হয়ে গেল।
আমরা আমাদের মাঝের রাম
কে হারিয়ে ফেললাম না ত?
-সায়ন আনজীর ২/১২/২০১৩
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন