মাঝে
মাঝেই মাথাতে একটা পোকা চাড়া দিয়ে ওঠে-নিজেকে মনে
হয় অথর্ব, অকাজের, বুদ্ধিহীন, ভীতু, জড় পদার্থ (সবগুলোই ঠিক!) তখন কোন কাজ ই ভাল
লাগে না; মনে হয় “ধুর শালা, কি আছে “গীবনে” (মুরাদ টাকলা ধন্যবাদ)”। কিন্তু কেন
মনে হয় তা বের করে নিজেকে তার চেয়েও বেশী অসহায় মনে হয়। বুঝতে পারি কতটা নিচে আমি।
নিজের অজান্তে কতটা বিক্ষুব্ধ আর বিবেক বর্জিত আমি। আমার চারপাশের যা কিছু অনিয়ম
আর স্বেচ্ছাচারীতা, তার দায় ত আমার উপরেও আছে। আমিও ত মুখ বন্ধ করে দেখেও না দেখার
ভান করে দ্রুত হেটে পার হয়ে যাই যেন আমাকে জড়াতে না হয়...
সবচেয়ে বড় কথা, চারপাশের এত এত বিরামহীন নিয়মহীন অব্যবস্থাপনা, এর মূল কারন
কি? শুধু শুধু আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল, সাবেক বিরোধী দল, ধর্মীয় দল, নিরধর্মীয়
দল ইতং বিতং নিয়ে কোন্দল করছি। আগে প্রচলিত ছিল, সরষের মাঝে ভুত; এখন ত paddy field এর ট্রাক্টরের diesel এ “কেরাসিন” !!! আমরা মোটামুটি আমাদের সবকিছুকেই একটা শিল্পের পর্যায়ে
নিয়ে গিয়েছি। কি সেই শিল্প? বিবেকহীন অনৈতিক যুক্তিহীন শিল্প ! (যারা যারা বিমূর্ত
শিল্পকলা ভেবে বসে আছেন তারা হাত তুলেন) আমরা এতটাই এই শিল্পের প্রেমিক, যে নিজেরা
একের পর এক এই শিল্প তৈরী করেই চলেছি না বুঝেই।
আমাদের মাঝে কয়জন আছেন যারা রাস্তায় হাটার সময় footpath ব্যবহার করেন? যেখানে footpath নাই
সেখানে রাস্তার পাশ ঘেঁসে হাটি? উত্তরটা দেওয়ার আগে আমাদের চিন্তা করে নিতে হবে,
কারন আমরা কখনই এভাবে ভাবি না। অথচ গ্রাম থেকে শহরে আসা একটা মানুষ ঠিক ঠিক এই
নিয়ম মেনে রাস্তায় চলে, সেটা গাড়ি চাপার ভয়ে হোক অথবা গাড়ি চাপা না পরলেও তার
চালকের গালাগালির ভয়ে হলেও হতে পারে। কিন্তু তাকে আপনি কোনভাবেই বলতে পারবেন না সে
নিয়মের লঙ্ঘন করেছে। আবার কয়েকদিন পরে, সেই গ্রামের লোকটাই যখন সরকারী কোন পদে
আসীন হবেন, তখন তার ভাবের ফাপড়ে অন্যদের কাপড় নষ্ট হতে পারে ! শুধু সে-ই না, তার
আত্মীয়-স্বজন সহ আশেপাশের লোকজন এমনকি বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া পর্যন্ত রাস্তাঘাটে
ফাঁপর দিয়ে বেড়ায়। যে মানুষ সারাজীবন (শুধু সারা জীবন না, তার বাবা, তার বাবা...
আব্বে Banglalink এর এড !!!) নিষ্পেষিত হয়ে এসেছে, সে সমাজের
প্রতি মজ্জাগত বিদ্বেষ প্রকাশ করবেই। আর সুযোগ পেলেই তার উসুল ও তুলবে । যেমন,
ড্রাইভার নেমে এসে দরজা না খুলে দিলে গাড়ি থেকে নামবে না... পিছনে জ্যাম লেগে যাক !!! একবার Green
road Comfort hospital এর
সামনে বিশাল জ্যাম লাগিয়ে এক পতাকাবাহী গাড়ি থেকে এক ছ্যাঁচড়া (এর চেয়ে ভাল কিছু
বলা সম্ভব না) নামলেন উনার ড্রাইভার দরজা খুলে ধরার পরে। আমি চিক্কুর দিয়ে বল্লামঃ
“আহ হা ! কি কষ্ট, গাড়িটা ক্যান লিফটের মধ্যে ঢুকানো গেল না !!!” (পিছনে হাসির রোল
পরে গেল) ছ্যাঁচড়া আমার দিকে আগুন দৃষ্টি দিয়ে তাকালো (ভাই, পুরা বাংলা ছবির ভিলেন
ইষ্টাইল!) আর বেচারা ড্রাইভার ও একটা মুচকি হাসি দিয়ে হাফ ছেড়ে বাচলো; নাহলে
পাব্লিক পরিবার সম্পর্কিত গালাগালিগুলো ওকেই হজম করতে হত ।
আমি কয়েকদিন হল একটা ছোট initiative নিয়েছি। আমি যতটা সম্ভব গাড়ির হর্ন না বাজিয়ে চালানোর চেষ্টা করি। খুব অবাক
করার মত বিষয়, আসলে হর্ন ছাড়া চালানো খুব কষ্টের কিছু না ! in fact, নিতান্ত বদ গোছের কেউ না হলে, আপনি অনায়াসে
হর্ন ছাড়া চালাতে পারবেন। তবে হ্যা, high beam/deeper light ব্যবহার
করতে হবে। আমি প্রায় প্রতিরাতেই বের হই আর অবাক হই, এই শহরের রিকশাওয়ালা পর্যন্ত
লাইটের মানে বোঝে। গাড়ির deeper দেখে পথ ছেড়ে দেয়। আরও অবাক
হয়েছি সিটি সার্ভিসের বাস (বিশেষ করে মিরপুর রুটের) যাদের side না দেওয়া আর “চাপ” মারার কুখ্যাতি আছে, তারাও deeper দেখে হাতের ইশারায় পার হয়ে যাওয়ার জন্য বলে অথচ হর্ন বাজালে ভ্রুক্ষেপ ও
করেন না। গাড়ির প্রসঙ্গ যখন আসলই, তখন আরেকটা উদাহরন দেই; কয়েকদিন আগে এক
ভদ্রগোছের অভদ্রলোক এর দেখা পেলাম। মিরপুরে সিএনজি পাম্পএ দাড়িয়ে আছি গ্যাস নেবার
জন্য, লোকটি খুব সুন্দর করে আমার গাড়ি ঘেঁসে ঘেঁসে হেটে যাচ্ছে, এর মাঝে স্বভাবতই
গাড়ি queue এ এগিয়ে যাওয়াতে শুধুই neutral থেকে gear আ
শিফট করাতে উনার ‘শইল্লে’ সামান্য touch মাত্র লাগে (honestly,
ওইটা শুধু touch বল্লেও বেশী বলা হবে, যারা জানেন তারা বুঝতেসেন)
লোকটা পট করে দাড়িয়ে আমার ড্রাইভারকে যা তা বলা শুরু করে দিল, শুধু ওইটুকু হলেও
চলত, কিন্তু যখন উনি গাড়ির side glass ধরে টানাটানি শুরু করে
দিলেন তখন আমার দাড়িয়ে থাকাটা সম্ভব হল না-আমি তাকে বললাম, driver এর পক্ষ থেকে আমি আপনাকে sorry বলছি, আপনি এইভাবে glass
টা ধরে টানলে তা ভেঙ্গে যাবে ! লোক টা একটা ছোট pause দিয়ে আবার বলা শুরু করে দিল- শুধু
sorry বললে হবে
নাকি? যখন দেখলাম উনি সমানে “ত্যানা” প্যাচাইতেছেন, তখন আমিও দিলাম একটু প্যাচ
(আমার ত প্যাচ মারা স্বভাব আগে থেকেই) খুব মোলায়েম সুরে বললাম, আপনি ত footpath
বাদ দিয়ে রাস্তা দিয়ে
হাটছিলেন তাই গাড়ি ত লাগিয়ে দিসে, কিন্তুক ! যদি আমার ছোট গাড়ি না হয়ে বাস বা
ট্রাক হইত, then এতক্ষনে ত aunty বিধবা
হইয়া যাইত ! এইবার ব্যাটা মহা খেপে গেল কারন আমি তাকে আকারে-ইঙ্গিতে “মামা” বানায়ে
ফেলসি! উনি বললেন- রাস্তা দিয়া হাটসিলাম মানে? আমি রাস্তা পার হইতেসিলাম!!! আমি বললাম-
আপনি ত আরেকটা নিয়ম ভাংসেন, অই যে foot over bridge, আপনি
অইটা ব্যবহার না করে এইভাবে রাস্তার divider ডিঙ্গায়া পার
হইতেসেন, আপনার পোলা-মাইয়া দেখলে কি শিখবে???
এইবার আসি আসল কথায়ে, “শিক্ষা” কি?
আমাদের এত এত সমস্যা এত ঝামেলা তার কারন কি? আমরা ত দেশের শিক্ষা সূচকে অনেক বিশাল
আয়তনে এগিয়ে গিয়েছি। এখন ত আমাদের দেশের ৭৮.৫৬% মানুষ শিক্ষিত (Wikipedia 2015 data, 61% according to UNESCO)! আমাদের দেশের গ্রামের স্কুলে পর্যন্ত কম্পিউটার আছে, ইন্টারনেট আছে (যদিও
তা তে মূলত ফেসবুক দেখা হয় আর “আই এয়াম যুনাইদ” প্র্যাকটিস করা হয়) যে দেশের মানুষ এর শিক্ষার হার এত, সেই দেশের
অবস্থা এমন কেন? উত্তরটা খোঁজার জন্য রকেট
বিজ্ঞানী দরকার নাই, শুধু country ranking according to literacy rate এর দিকে তাকালেই চলবে। আমাদের মাঝের আমরা শুধুই দেখি “কতটা” শিক্ষিত “আমাদের”
মাঝে। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছি শিক্ষিত বলতে আমরা কি শুধুই একটা সার্টিফিকেট
কে বোঝাচ্ছি কি না?
আমার মনে পরে আইবিএ-তে এনামুল হক স্যারের ইকোনমিক্স এর প্রথম ক্লাসের প্রথম
কথা। উনি আমাদের কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শিক্ষা কি? আমরা মোটামুটি মাথা চুল্কে চলটা
তুলে ফেলসিলাম কিন্তু সঠিক উত্তরটা দিতে পারিনি। উত্তরটা হল, enlightenment , আলো ! “আমি এসেছি এখানে
অন্যদের enlightened করতে। to give you thoughts of
mind, broaden your thinking”; স্যারের মুচকি
হাসির ফাঁকে এই অমোঘ বাক্যটি সারাটা জীবন যেন জ্বলজ্বল করবে।
আসলেই কিন্তু তাই। শিক্ষিত সেই মানুষ, যার কাছ থেকে অন্য মানুষ কিছু শিখে। তার
মানে এই না যে যেই মানুষটা সারাক্ষন অন্যদের “শিক্ষা” দিয়ে বেড়ান উনি মহা শিক্ষিত...
(যার নজির আমরা দেখি, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় মাপের কোন অনুষ্ঠানে মহা সম্মানিত
অতিথি আসেন কোন রকমে স্কুল পাশ করা মহান নেতা !!!) যে মানুষটির নিজের অজান্তে অথবা
কাজের মাধ্যমে অন্য মানুষের মাঝে শিক্ষা প্রচারিত হয়, সেই শিক্ষিত। একটু ভাবেন ত,
আমাদের কয়জন এভাবে চিন্তা করেছি? আমি ত প্রতিনিয়ত ভয় পাই, আমার বাজে জিনিসগুলো
আমার সন্তান রা যেন না শিখে ফেলে। আমি জানি আপনারাও এভাবে সতর্ক থাকেন। কিন্তু
নিজের সন্তান বাদে? অন্যদের ক্ষেত্রে?
আমাদের সমাজে অনেকে আছেন যারা বড়াই করেন, “আমি ত দুই যুগ ধরে বিদেশে থাকি, এই
দেশের বাজে culture আমার মাঝে
নাই” (খারান একটু হাইস্যা নেই...হাহাহা) বিদেশ এ থাকা টা যদি আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট-র
মাঝে ফুটে উঠত তাহলে আপনি আর এই কথা বলতেন না !!! একটা কৌতুক মনে পড়ে গেল,
এক বিয়ে বাড়িতে এক মহিলা এক লোককে দেখে বলছেঃ “আমি আমার বাচ্চাদেরকে যেভাবে বড়
করছি তা দেখে যে কেউ স্বীকার করবে আমি কতটা modern”...
লোকটি জিজ্ঞেস করলঃ তাই? আপনি কি করেন?
ঃ আমি বিদেশে থাকি, আপনি?
ঃ অহ, আমি ঢাকা তে থাকি...
হাহাহা, কেউ হাসল না দেখে নিজেই হাসি, হাজার হলেও বিদেশে থাকা মানুষরা আমার
সামনে নিদেনপক্ষে এইটাকে credit হিসাবে
নেওয়ার আগে ৩/৪ বার ভাববে...(সায়ন যেই জিনিশ, অর সামনে না-ই বা বলি...) তবে বেশির
ভাগ সময়ে, এই credit নেওয়াটা ঘটে supplementary ব্যাক্তি বর্গের মাঝে। মানে হল, যারা অন্যের উপর ভর করে বিদেশে
গিয়েছেন-নিজের জন্য বা নিজের যোগ্যতায় না। যেমনঃ toilet cleaner কিনলে মগ free, লুঙ্গি কিনলে রুমাল free, সাবান কিনলে soap case ফ্রী, গাড়ি
কিনলে এক কেজি পিঁয়াজ free... (রোজার দিন...) সেইরকম আর কি,
জামাই বিদেশ গেসে-বউ ফ্রি তে গেসে...
Credit
নেওয়ার বিষয়টা যখন আসলোই, তখন আরও সুন্দর উদাহরন দেওয়া যায়, আমাদের
এই সমাজে উপকারীর উপকার অস্বীকার করা একটা বিশাল credit এর
ব্যাপার। শুধু তাই ই না, উপকারির অপকার করা ত celebrity পর্যায়
পরে যায়! হয়ত, একটা ৭/৮ জনের সংসার চলত একটা মানুষের উপরে ভরসা করে, সেই মানুষটার
নীরব কষ্ট স্বীকার করা উপার্জন থেকে সাহায্য নিয়ে চলত সেই সংসার; তার টাকায় ভর করা
ভবিষ্যত, সংসারের ছোটদের- কিন্তু এক সময়ে গিয়ে দেখা যায়, ওই সংসারের সবচেয়ে
অবহেলিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষ সে-ই! কারন ততদিনে ভবিষ্যত তৈরী হয়ে গেছে, তাকে আর
দরকার নাই। তার কষ্টগুলো তখন দেখা হয় বাতুলতা হিসাবে। এমন উদাহরন শুধু সিনেমাতে
না, বাস্তবেও প্রচুর আছে। তথাকথিত “শিক্ষিত”, অথবা credit নেওয়া
প্রবাসী পরিবারের মাঝেই আছে !
আমাদের দেশে আইন ভেঙ্গে বা নিয়ম ভেঙ্গে চলা কে ভাবা হয় খুব credit এর কাজ! রাস্তা তে মহা জ্যাম, উলটা
পথে পু পু করে সাইরেন বাজিয়ে চলে যান, what a ভাব ! কোনখানে
বিশাল queue? মাঝখানে ঢুকে বলেন, “জানেন আমি কে?” অত্যান্ত
ভাব-বাচক ব্যাপার !!! কিন্তু আমরা এর উলটা টা চিন্তা করে দেখি না। যে মানুষটা
ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করল না, উপরন্তু, সেটা লুকিয়ে রাখার জন্য নিতান্ত
সাধারন হয়ে চলল, অন্য মানুষ জানতে চাইবে, “উনি কে ভাই?” নিজের পরিচয় দিয়ে কাজ আদায়
করার চেয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে পরিচয় প্রচার কি বেশী ভাল না?
মহান স্রষ্ঠার কাছে, আমার বাবা-মা, বোন, স্ত্রী, পরিবার আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে
আমি প্রতিনিয়ত কৃতজ্ঞ, পৃথিবীর অনেককিছু আমাকে তারা দেখিয়ে দিয়েছেন। কোনটা ভাল
ভাবে, কোনটা কেন খারাপভাবে তার যুক্তি হয়ত আমি জানি না। কিন্তু তার প্রত্যেকটা
আমাকে দিয়েছে অভিজ্ঞতা- শিক্ষা। আমিও যেন আমার সেই শিক্ষাটা একটু করে হলেও ছড়াতে
পারি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, সেটাই কামনা করি । আর যাই হোক আমাকে গন্ড মূর্খ
বলা ঠেকাতে হবে।
কে জানে, হয়ত সেটাই আসলে মানবসভ্যতার মূল উদ্দ্যেশ্য !
সায়ন
২১ জুন ২০১৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন